প্রসঙ্গ : আধুনিক কিশোর কিশোরী।

গতকাল আমার এক মামাতো বোন, সবে ৯ম শ্রেনীতে পড়ে, তার কাছ থেকে একটি মোবাইল সেট পাওয়া গেল যা সে গোপনে ব্যবহার করত এবং সেটি নাকি তার এক বয়ফ্রেন্ড তাকে উপহার দিয়েছে। এ নিয়ে বাসায় অনেক ঝগড়া, মারামারি। এক পর্যায়ে সেই মামাত বোন বলে বসল,
"আমার যা ইচ্ছা তাই করব, পারলে আমাকে ঠেকাও"।
এরকম হাজারো উদাহরণ হয়ত পাওয়া যাবে আমাদের আধুনিক কিশোরদেরকে নিয়ে।
আজ বিগ্গানের এ স্বর্ণযুগে কৈশোর উৎযাপনের নানা উপকরণ হাতের কাছে সহজে পেয়ে কিশোর কিশোরীরা হয়ে উঠেছে আরো বেপরোয়া, আরো দু:সাহসী, আরো অবাধ্য, আরো গোপনীয়তাপ্রিয় এবং আরো কৈাতুহলী। তাদের সামাল দিতে গিয়ে মা বাবা ভাই বোন বয়োজ্যেষ্ঠদের অবস্থা কাহিল। একদিকে নিষেধ করছেন তো অন্যদিক অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। সেই সুযোগে আমাদের কিশোররা নিজেদের জাহির করতে গিয়ে অবতারনা করছে নতুন নতুন হাড় জ্বালানো কিশোর কিশোরী কাহিনী। তাদের বাগে আনতে মা বাবার কষ্টের সীমা নেই।
আজকাল আমাদের কিশোর কিশোরীদের হাতে আসছে নতুন নতুন সামগ্রী যেমন: মোবাইল, ইন্টারনেট, ই-মেইল, চ্যাটিং, টিভি, ম্যাগাজিন ইত্যাদি। সাথে যোগ হচ্ছে বাইরের টান, প্রেম, বন্ধুত্ব ইত্যাদি। অনেক শিক্ষিত চাকুরিজীবি মা বাবা সারাদিন বাইরে থাকার সুযোগে তারা সুযোগ পাচ্ছে অবাধ স্বাধীনতার। আর এখন শহরের পরিবারগুলো বেশীর ভাগই নিউক্লিয়ার পরিবার। আগে সরকারের ঘোষনা ছিল -
"ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট"। এখন আরো মোডিফাই করে বলা হচ্ছে "একটি থাকলে দ্বিতীয়টি আর এখন নয়"। এসব পরিবারের ৫০% পরিবারে অবসথান করে দাদা দাদী কিংবা নানা নানী। আর বাকি পরিবারগুলো থাকে গৃহপরিচারিকাদের তত্বাবধানে। যে সব পরিবারে বয়োজ্যেস্ঠরা অবস্থান করে সেসব পরিবারের কিশোর কিশোরীরা বয়োজ্যেস্ঠদের আবেগের বশে ফেলে সুযোগের সদ্যবহার করে। আর গৃহপরিচারিকাদেরকে তারা ধমকের সাহায্যে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসে।
যখন কিশোর কিশোরীদের স্কুল কলেজ বন্ধ থাকে তখন তো ঘটে আরেক মজার ঘটনা। বাসায় অফিস থেকে ফোন করে মা বাবারা সারাদিন লাইনই পান না। সারাক্ষন অকুপাইড। পরে জানা যায় তার আদর্শ কিশোর কিশোরী ক্লাসমেটের সাথে পড়ার বিষয়ে বা নোটের বিষয়ে আলাপ করছিল।
অনেক পরিবারের কিশোর কিশোরীরা আবার একধাপ এগিয়ে। তাদের বাবা মা অফিসে চলে গেলে বন্ধুদের বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়ে বড়দের ভিডিও দেখে, নাচগান করে জোরে জোরে অডিও ছেড়ে, অথবা নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে। এসব কিশোর কিশোরীরা এক সময় সারা জীবনের জন্য পরিবারের হতাশার কারণ হয়ে দাড়ায়। কোন কোন বাবা মা আর্থিকভাবে নি:শেষ হয়ে যান তাদের নেশার খরচ জোগাড় করতে। অপারগ হয়ে পড়লে ওদের হাতে মার খান বা নিহত হন। প্রাণে বাচাতে কোন কোন মা বাবা তাদের পুলিশের কাছে সপে দেন। কোন কোন কিশোর লুকিয়ে পিনআপ পত্রিকা পড়ে। কেউ কেউ আবার বেশী পেৌরুষ দেখাতে হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। কোন কিশোর আবার কিশোরীদের উত্ত্যক্ত করে নিজেকে মাস্তান প্রতিপন্ন করতে গর্ব বোধ করে।
কারো কারো ক্ষেত্রে অন্যটাও ঘটে। বাবা মায়ের কড়া নির্দেশে স্কুল বা কলেজ থেকে সময়মত ফিরতে হয়। কিন্তু ঘরে বসে করবেটা কি? সব সময় কি আর পড়তে ইচ্ছে করে? তখন তারা ইন্টারনেটে বসে। চ্যাট করে। বিভিন্ন নিষিদ্ধ ওয়েব সাইটে ঢুকে।
এসব কিশোর কিশোরীদের নিয়ে আমার মামা মামীর মত অনেক মা বাবা শঙ্কিত, সন্দিহান, কিন্তু বয়স নামক স্বধর্মকে অস্বীকার করতে পারেননা কেউ। কিশোর কিশোরীদের বাগে আনতে তারা কত কিই না করছেন। নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে তাদের মানসিকতা বিচারের।
তবে সমাজে সুবোধ কিশোর কিশোরীও আছে। ওদের সুশিক্ষিত মা বাবারা তাদের মনোজগতের বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এ বয়সটাকে হ্যান্ডেল করে। ছেলেমেয়েদের সাথে এসব মা বাবারা গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন। তারা ছেলে মেয়ের স্বার্থেই তাদের দাম্পত্য জীবনে মধুর সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং এর প্রভাব ছেলেমেয়ের উপরে পরে। তারা ছেলেমেয়েকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের জিগ্গাসা কেৌতুহলের জবাব তারা সঠিকভাবে দেন, প্রয়োজনে শাসন করেন, বই-পত্রিকা পড়া ও সুকুমার বৃত্তির চর্চায় উৎসাহিত করেন। পারিবারিক অটুট বন্ধনে পরিবারই হয় যাদের সকল আনন্দের উৎস-সেসব পরিবারের কিশোর কিশোরীদের নিয়ে কোন দুশ্চিতা করতে হয়না।
ধন্যবাদ।
link:http://prothom-aloblog.com
0 comments:
Post a Comment